নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের লেখায় খাবারের লোভনীয় বর্ণনা

PUBLISHED:Mar 10, 2018 | UPDATED:12:44 PM, Mar 10, 2018

হুমায়ূন আহমেদের লেখা মানেই অসাধারণ বর্ণনায় ছোট্ট জিনসটাকেও সুন্দর ভাবে উপস্থাপন।  ‘এবং হিমু’ বইটাতে তিনি হাঁসের মাংস নিয়ে লেখেছেন ‘হেমন্তে নতুন ধান খেয়ে হাঁসের গায়ে চর্বি হয়, সেই হাঁস নতুন আলু দিয়ে ভুনা করে শীতের সকালে চালের রুটি দিয়ে খাওয়ায় যে কি স্বাদ’ অথবা ‘চাকচাক করে কাটা আলু ঘিয়ে ভেজে তার সাথে ভাজা শুকনা মরিচ মাখিয়ে ভাতের সাথে খাওয়া’। 

হুমায়ুন আহমেদের প্রতিটি লেখাতেই আছে এরকম অসামান্য বর্ণনা। কালিজিরা চালের প্রতি সম্ভবত তার বিশেষ দুর্বলতা ছিলো, বেশ কয়েকটি লেখায় এসেছে এর উল্লেখ। ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাসে কালিজিরা চালের ভাতের সাথে ছিলো মুরগীর মাংস আর ‘মধ্যাহ্ন ২’ উপন্যাসে কালিজিরা চালের ভাতের সাথে বেড়ে দেয়া হয়েছে বাটিভরা খাসীর মাংস আর পেঁয়াজ।  দুটি বর্ণনাই জিভে জল আনার মত।

একইভাবে  ‘ইলিশ মাছের ডিমের তরকারি’র কথা এসেছে বেশ কয়েকটি উপন্যাসে। 
হুমায়ুন আহমেদ কিন্তু শুধুমাত্র এরকম বিলাসী খাবারের কথাই বলেন নি, অনেক সাধারণ খাবারের অসাধারণ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। এই যেমন “জোছনা ও জননীর গল্প” এ শেষদিকে আছে, ‘মরিয়ম বসে আছে তাদের বাসার সিঁড়ির সামনে। আজ সারাদিন সে কিছু খায়নি। যদিও ঘরে অনেক কিছু রান্না হয়েছে। এর মধ্যে অনেক তুচ্ছ রান্নাও আছে। একটা হোল খুবই চিকন করে কাটা আলুর ভাজি। আরেকটা হল কাঁচা টমেটো পুড়িয়ে ভর্তা। এই দুটা আইটেম নাইমুলের পছন্দ। মরিয়ম নিজে রেঁধেছে নতুন আলু দিয়ে মুরগীর মাংসের ঝোল।”
আবার ‘মধ্যাহ্ন ২’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘শরিফা অতি দ্রুত খাওয়ার ব্যবস্থা করল। গরম ভাত। খলিসা মাছের ঝোল, পাট শাক, ডাল।‘ ‘মাওলানা খেতে বসেছেন। শরিফা সামনে বসে গরম ভাতে পাখা দিয়ে হাওয়া করছে। আজকের আয়োজন ভালো। করিমের পছন্দের পাবদা মাছ। হাওরের লালমুখো বড় পাবদা। ঝোল ঝোল করে রান্না। শরিফা পাতের কোণায় আদা সরিষা বাটা দিয়ে রেখেছে। তরকারির সাথে এই জিনিস মিশিয়ে খেতে খুবই ভালো লাগছে’।
‘পিতা ও কন্যা দুজনকেই খাবার দেয়া হয়েছে। অ্যালুমিনিয়ামের গামলা ভর্তি ভাত। ভাতের উপর গাওয়া ঘি। একপাশে ডিমের সালুন। আলাদা বাটিতে ডাল। ঘিয়ের গন্ধে জায়গাটা ম ম করছে’।
‘সবুজ কলাপাতায় ধবধবে সাদা ধোঁয়া উঠা গরম ভাত।ঝিঙ্গা দিয়ে রাঁধা লাবড়া, সঙ্গে মাছের ঝোল। খেতে খেতে লাবুসের মনে হলো, জগতের সর্বশ্রেষ্ঠ আনন্দ ভরপেট খাওয়ায়। এইজন্যেই হয়তো বেহেশতে খাওয়া- খাদ্যের বর্ণনায় এতো জোর দেয়া হয়েছে’।
উপন্যাসের প্রতিটি বর্ণনা এতো সুন্দর, এতো নিখুঁত করে দেয়া যে তন্ময় হয়ে পড়তে পড়তে আসলেও যেন সুঘ্রাণ পাওয়া যায়! উনার আরো অনেক লেখায় এরকম অনেক বর্ণনা আছে, আগ্রহীরা পড়ে এবং খেয়ে দেখতে পারেন। বিভিন্ন লেখায় আবার হুমায়ুন আহমেদ কিছু খাবারের রেসিপিও দিয়েছেন। ঘরে বানানো এক্সপ্রেসো কফি, পুঁই পাতায় কইমাছের ডিমের রান্না অথবা শিং মাছের ডিমের পাতুরি। উনার দেয়া শিং মাছের ডিমের পাতুরির রেসিপি ছিলো এরকম, ‘শিং মাছের ডিমের সঙ্গে সামান্য মশলা দেবেন। কাঁচামরিচ লাগবে। পিঁয়াজ দেবেননা। কলাপাতা দিয়ে ডিম মুড়িয়ে ভাতের মধ্যে দিয়ে দিতে হবে।

একই উপন্যাসে লেখক আরেক খ্যাতনামা ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর প্রসঙ্গে বলছেনে, ‘বিভূতিভূষণ আলাভোলা ধরণের মানুষ। খাওয়াদাওয়ার গল্প করতে খুব পছন্দ করেন।…………লাবুসের বাড়ীতে যে আদর এবং যত্ন লেখকের জন্যে অপেক্ষা করছিলো তার জন্যে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি অভিভূত হয়ে গেলেন। রাতের খাবারের বিপুল আয়োজন। যেখানে তিনি খেতে বসেছেন তার কাছেই তোলা উনুন আনা হয়েছে। সেখানে তেল ফুটছে। বেসনে ডুবিয়ে বকফুল ভেজে লেখকের পাতে দেয়া হচ্ছে’।  

এ রকম আরও অনেক লেখায় আরও অনেক খবারের বর্ণনা আছে যা পড়লে সত্যি মনে হয় খাবারগুলো যেন চোখের সামনে এসে হাজির হয়ে যায় আর মনের অজান্তে জিভে জল চলে আসে।

লেখাঃ খেয়া 

food reviews foodiez Humayun Ahmed foodies voice
Was this review helpful? Yes
0 Helpful votes

Advertisement