ধানমন্ডির হান্ডি রেঁস্তোরার অভিনব ভ্যাট জালিয়াতি

ধানমন্ডির হান্ডি রেঁস্তোরা:

Rupayan Plaza, Satmasjid Road, Dhanmondi 10/A. Dhaka

Handi Dhaka
Indian
Rupayan Plaza, Satmasjid Road, Dhanmondi 10/A. Dhaka

 

পিওএস সফট্ওয়্যার টেম্পারিং ও কাস্টমারকে ভূয়া চালান দিয়ে দুইশগুন পর্যন্ত ভ্যাট আত্মসাত, ভ্যাট চালানের বান্ডিল ডাস্টবিনে!!

রেঁস্তোরার নাম হান্ডি!
ঠিকানা তার ধানমন্ডি!
নামে কামে আহারি,
সাজগোজে বাহারি! 
ব্যবহারে মাঝারি।
দুইশগুন ভ্যাট চুরি,
ধরা খেলো জোচ্চুরি!!

আইনি নিয়মে চলছে পরিপাটি ব্যবসা তার। অবকাশই নেই বোঝার বা সন্দেহ করার। জমজমাট হান্ডি-মালিকের ব্যবসার পসার! আসনের জন্য দাঁড়িয়ে অপেক্ষার মিছিল বুভুক্ষু ভোক্তার । খেয়ে ভ্যাটসহ বিল দিচ্ছেন পরিতৃপ্ত কাস্টমার। ভাবছেন বৈধ পিওএস চালানে ভ্যাট পাচ্ছে সরকার। হান্ডির এমন রমরমা দৃশ্য সবার চোখে পড়বার!

৯ ও ১০ মার্চ অভিযানের আগে আমরাও তাই ভাবতাম। হান্ডির পিওএস চালানের ছবি দেখে অসংখ্য অভিযোগ আমরা নাকচ করেছি। এখন দেখছি, 
ফিটফাট ওপরে, সদরঘাট ভেতরে!!

আসলে কী ঘটছে এই হান্ডিতে....!!

সাতদিন চোরের একদিন গৃহকর্তার। 
কাস্টমার থেকে নেয়া দুইশ টাকা ভ্যাট থেকে ঠিকমতো এক টাকাও জমা দেন না উনি। খুব কায়দা করে প্রযুক্তি আর কুবুদ্ধির অপসম্মিলন ঘটিয়ে রাষ্ট্রের টাকা লুটে নিচ্ছিলেন। সরকার অনুমোদিত সফট্ওয়্যারে টেম্পারিং/হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ। এই পিওএস (পয়েন্ট অব সেল) টেম্পারিং করেছেন উনি। একই ক্রমিক নম্বরে তিনটি থেকে আঠারটি পর্যন্ত ভূয়া চালান ইস্যু করছেন।

চুরির এ মহান ও জটিল কাজের জন্য তিনি প্রশিক্ষিত ম্যানেজার কর্মচারি রেখেছেন। তাদের 'বুক ফাটেতো মুখ ফাটে না' নীতিতে সফল দীক্ষা দিয়েছেন। দিনের পর দিন এটা চালিয়ে গেছেন। ১০ মার্চ এসে ভ্যাট গোয়েন্দার হাতে ধরা পড়লেন। এটাও কখনো ধরা পড়তেননা, বেরসিক ভ্যাট গোয়েন্দা তার প্রশিক্ষিত সামন্তের নিরাপদ দুর্গে আক্রমন না হানলে!

অভিযোগসূত্র: 
"বার বার ঘুঘু খেয়ে গেছে ধান,
এবার ফাঁদে পড়ে দিতে হচ্ছে প্রাণ।" 

দেশের একজন প্রবীণ ও সম্মানিত শিক্ষাবীদ এই ঘুঘু ধরলেন। এদের নাম ধরে একটি চালানের কপি দিয়ে অনলাইনে অভিযোগ করেন (যদিও ওই চালানটি তার রেকর্ডে আমরা পাইনি)। অভিযোগটি আমাদের প্রাধিকার তালিকায় নেই।

হান্ডিতে গোয়েন্দা হানা: 
৯ই মার্চ আমরা অভিযোগ পাই। ওই দিনই টীম পাঠিয়ে দেয়া হয়। তখনো অপরাধের ক্ষেত্র ও মাত্রা নিয়ে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না। চাওয়ামাত্র একান্ত বাধ্যগতের মতো সব রশিদ, রেজিস্টার বের করে দিলেন হান্ডির প্রশিক্ষিত ম্যানেজার। কিন্তু আসল কুকর্ম আমাদের বুঝতে দিলেন না। সরল বিশ্বাসে আমরা এমন ভালো মানুষদের সিস্টেম না খুলেই কাগজপত্র নিয়ে দপ্তরে ফিরে আসি।

দ্বিতীয় দফা অভিযান:
"ধরা পড়লে 'চুরি',
নইলে ফলাবেন দাদাগিরি!"

প্রতিদিন অভিযান শেষে আমরা এর ভালোমন্দ দিক ও প্রমানাদি বিশ্লষণ করি।সাক্ষ্যসবুতের সাথে আমাদের হাতে আসে একইদিনে একই নম্বরে ইস্যু করা দু'তিনটা চালান (ওরা ভুলে করে দিয়ে থাকবে)। আমরা দ্বিধান্বিত! এটা আর কখনো দেখা যায়নি। সিদ্ধান্ত হলো আবার অভিযান হবে। পরদিন ১০মার্চ টীম আবার গেলো। তার প্রশিক্ষিত সামন্তরা এটা ভাবতেই পারেনি! এদিন ম্যানেজার সাহেব 'আমাদের সব ঠিক আছে' দাবী করে সিস্টেম খুলতে এবং তল্লাশি করতে আপত্তি ও গড়িমসি করছিলেন।

ময়লার ড্রামে ভ্যাট চালান:
"অপরাধী নিজ কর্ম নিরন্তর ঢাকতে চায়,
নিজের অজান্তে পদচিহ্ন রেখে যায়!"

আপত্তি উপেক্ষা করে এগুতে থাকে গোয়েন্দা-তল্লাশী। প্রমাণ ছাড়া মামলা দাঁড়াবে না। তিনটি স্টোররুম তন্ন তন্ন খোঁজা হলো। পাওয়া গেলোনা কিছু। সিস্টেম খুলে নিয়ে গোয়েন্দারা কাজ শেষ করে মূসক-৫ দিয়ে ফেরার জন্য যখন উদ্যত, এসময় সিঁড়ির পাশে দুটো ড্রাম নজরে এলো একজন গোয়েন্দার। স্পষ্টত, ড্রামগুলো দ্রুত সরিয়ে প্রমাণ নষ্ট করতে গিয়ে 'পড়বিতো পড় মালির ঘাড়ে' অবস্থা। নিজের হাতেই অপরাধের প্রমাণ সামনে নিয়ে এলেন।


'ড্রামগুলো এখানে কেন' জিজ্ঞেস করতেই দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারির মুখে শব্দ জড়িয়ে এলো। ড্রাম খুলে দেখাতে বলা হলো। টালবাহানা দেখে ওই কর্মকর্তা নিজেই ঢাকনা খুলে খাবারের ময়লার নিচে কিছু নীল রংয়ের কাগজ দেখলেন। দুর্গন্ধযুক্ত বর্জ্য খাবারের ময়লার ড্রামের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে প্রথমে ছয়টি পরে একে একে বের করে আনলেন অসংখ্য নীল কাগজ। এগুলো সবই ভূয়া চালান।

রাষ্ট্রের টাকা মেরে রাষ্ট্রকে দক্ষিণা: 
হান্ডির মালিক কি গরীব!? চট্টগ্রামেও খেতে গিয়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। লাভের টাকায় তার পেট ভরে না। বাঁচার জন্যে তার রাষ্ট্রের ভ্যাটের টাকা মেরে খেতে হবে। তিনি দেশের ভ্যাটের দুশ টাকা মেরে এক টাকা দক্ষিণা দেবেন!!

একচালানে ফাঁকি দুইশগুন:
৯মার্চ তারা কতগুলো চালান ইস্যু করেছেন তার পূর্ণাঙ্গ হিসেব উদ্ধার করা যায়নি। এদিন ১২৯৯ ক্রমিকের ১৮টি চালানে ভ্যাটসহ তার মোট বিক্রি ২৩,০২৭ (তেইশ হাজার সাতাশ) টাকা। সরকারের জন্য রেখেছেন ১১৫ টাকার চালানটি এবং ভ্যাট মাত্র ১৫টাকা। তসরুফের হার ২০০গুনেরও বেশী নয়কি! এভাবে ১৩০০ক্রমিকের ১১টি, ১২৯৩ক্রমিকের ৮টি, ১২৯২ ক্রমিকের ৮টি চালান পেয়েছি (চালানের কোলাজ ও হিসেবের সারণী দিয়েছি)?

ডাস্টবিনে চালান লুকনোর মনস্তত্ত্ব: 
ডাস্টবিনে চালান ফেলার মনস্তত্ত্ব কী! ময়লার ভেতরে কেউ দেখবে না বা দেখলেও দূর্গন্ধে এর কাছে যাবে না। এই মনস্তত্ত্বে উনি আগে সফল হলেও ভ্যাট গোয়েন্দার বেলায় আর হলো না! নিরাপত্তারক্ষীর সহায়তায় ভবনের নিচে পার্টিশনের পেছনে আরো পাঁচটি পুরনো ময়লার ড্রাম খুঁজে বের করে। বাইরে থেকে লোক ডেকে আনে। কাজ এগোয়না বলে কর্মকর্তা নিজেই হাত দিয়ে ওই দূর্গন্ধের ভেতর থেকে বাকি চালানগুলো উদ্ধার করেন(ছবিতে দেখুন)।


স্পষ্টত, কেবল একটি চালান ভ্যাট অফিসের জন্যে রেখে বাকিগুলো ডাস্টবিনে ফেলেছেন। যেগুলোর ভ্যাট সরকার পায়নি! কোনকালে পেতোও না।

অভিনব জালিয়াতি: 
অবিশ্বাস্য!! হার মেনেছে যেখানে কল্পনা ও বিশ্বাস! তবু এটাই ধানমন্ডির হান্ডি রেঁস্তোরার বাস্তবতা। সফট্ওয়ার টেম্পারিং/জালিয়াতির ঘটনা আমাদের কাছে এ প্রথম। একই নম্বরে বার বার ভূয়া চালান ইস্যুর জন্য এটা করেছেন। এটা প্রকৃতই অভিনব! হান্ডির এমন কাজে ভ্যাট গোয়েন্দা টীম যতোটা অবাক হয়েছে তার চেয়ে বেশী মর্মাহত হয়েছে। তাহলে আমরা কাকে বিশ্বাস করবো! এভাবে মোট কতো চালান ইস্যু হয়েছে সব প্রমাণ ভ্যাট গোয়েন্দারা পায়নি। আগেরদিন অভিযানের সময় যে চালানগুলো লুকিয়ে ফেলে দিয়েছিল সেটাই কেবল উদ্ধার হয়েছে।

কী বলবেন এটাকে? চুরি, ডাকাতি, দেশের প্রতি জুলুম, ডিজিটাল জালিয়াতি, নাকি সাইবার প্রতারণা। যাই বলুন, কম বলা হবে। ঠান্ডা মাথায় দিনের আলোয় সবার চোখে ধুলো দিচ্ছে হান্ডির মালিকের মতো সমাজের একজন প্রতিষ্ঠিত ও বিত্তবান মানুষ। এভাবে খেয়ে ফেলছেন ভ্যাটের টাকা! তার প্রশিক্ষিত ম্যানেজার কর্মচারীর হাবভাবেও বোঝার উপায় নেই।

সচেতনতা আরো গভীরে পৌঁছাতে হবে: 
এভাবে অভিনব জালিয়াতির মাধ্যমে হান্ডির মালিক দিনের পর দিন ভ্যাটের টাকা আত্মসাত করে গেছেন। প্রতারিত হয়েছেন কাস্টমার ও সরকার দুপক্ষই।
হান্ডির মতো নামী ও প্রতিষ্ঠিত রেস্টুরেন্টের এমন কান্ডের পর এখন আমাদের ভোক্তাদের দায়িত্ব আরো বেড়ে গেলো। আমাদের সচেতনতা আরো গভীরে পৌঁছাতে হবে। একটা ইউনিট মাসে কতো ভ্যাট দেয় সেটারও খবর নিতে হবে। ইসিআর পিওএস সঠিক কিনা খোঁজ নিতে হবে। প্রয়োজনে আমাদেরকে বা ভ্যাট অফিসকে জানাতে হবে।

লোভে পাপ, পাপে নিপাত: 
সমাজে লোভীর সংখ্যা আমজনতার তুলনায় খুব বেশী না। সূক্ষ্ম ও প্রযুক্তিবাজ লোভীর সংখ্যা আরো কম। এদের খুঁজে বের করা কঠিন নয়। এ দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। এদের নিপাত দেখাতে হবে।

মনে রাখতে হবে, দেশের সম্পদ মেরে খাবার অধিকার লুটেরাদের নেই। এ দেশ আমাদের। এর সম্পদও আমাদের। এর রক্ষার দায়িত্বও আমাদের সবার। হান্ডির মালিকের মতো বিত্তবান ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষদের এদেশের আমজনতার সম্পদ চুরিতে রুখতে হবে। এটা কেউ একা পারবেন না। সম্মিলিত চেষ্টাতেই আমাদেরকে সফল হতে হবে।

"লোভী লুটেরা রুঁখবো 
শুদ্ধ বাংলা গড়ব।"

Source: https://www.facebook.com/vatintelligencebd/photos/pcb.984252788318383/984249634985365/?type=3&theater

Was this review helpful? Yes
0 Helpful votes

Comments (0)

{{comment.CommentText}}

{{comment.CommentDateFormated}} Like